লালন সরকার, দেবীগঞ্জ (পঞ্চগড়)
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রজনন বীজ উৎপাদন কেন্দ্রে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষকদের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) উদ্ভাবিত ‘খামারি’ মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে কৃষকরা এখন তাদের জমির উপযোগী ফসল নির্বাচন, সঠিক সার প্রয়োগ এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সহজেই পাচ্ছেন।
মাঠ পর্যায়ে ‘খামারি’ মোবাইল অ্যাপের সার সুপারিশ যাচাইয়ের লক্ষ্যে বারি আলু-২৫ এর প্রদর্শনী ট্রায়ালের মাঠ দিবসে শস্য নমুনা উত্তোলন করা হয়েছেবৃহস্পতিবার (৫ মার্চ ) দেবীগঞ্জ প্রজনন বীজ উৎপাদন কেন্দ্রে এ মাঠ দিবসের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের সদস্য প্রফেসর এএসএম গোলাম হাফিজ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দেবীগঞ্জ প্রজনন বীজ উৎপাদন কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শাহাদাত হোসেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুছ ছালাম, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) পরিচালক (সরেজমিন উইং) মো. ওবায়দুর রহমান মন্ডল।
মাঠ দিবসে বারি আলু-২৫ এর চাষাবাদ পদ্ধতি, সম্ভাব্য ফলন এবং ‘খামারি’ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সার ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। বক্তারা মাঠ পর্যায়ে প্রযুক্তি যাচাইয়ের মাধ্যমে কৃষকদের জন্য আধুনিক ও কার্যকর সার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বক্তারা আরও জানান, আলু বাংলাদেশে বহুল ব্যবহৃত একটি জনপ্রিয় সবজি এবং রপ্তানি যোগ্য অর্থকরী ফসল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের কৃষি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ১ কোটি মেট্রিক টনেরও বেশি আলু উৎপাদিত হয় এবং গড় ফলন প্রায় ২২ টন প্রতি হেক্টর। দেশের উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে পঞ্চগড় জেলা আলু উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
প্রদর্শনী ট্রায়ালের ফলাফলে দেখা যায়, ‘খামারি’ অ্যাপের সুপারিশ অনুযায়ী ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়েছে ১৯.১০ কেজি, যেখানে কৃষকের প্রচলিত পদ্ধতিতে ব্যবহার করা হয়েছে ২২.৭২ কেজি-অর্থাৎ অতিরিক্ত ৩.৬২ কেজি। টিএসপি সারের ক্ষেত্রে খামারি অ্যাপের পরামর্শ ছিল ৬.১৫ কেজি, অথচ কৃষক ব্যবহার করেছেন ২২.৭২ কেজি, যা ১৬.৫৭ কেজি বেশি। একইভাবে এমওপি সার ১৪.০৬ কেজি এবং জিপসাম ১.৯৪ কেজি অতিরিক্ত প্রয়োগ করা হয়েছে কৃষকের প্রচলিত চর্চায়।
খামারি অ্যাপের পরিমিত সার ব্যবহারের পরামর্শ অনুসরণ করে আলুর চাষে আশাব্যঞ্জক ফলাফল পাওয়া গেছে। খামারি অ্যাপভিত্তিক প্লটে ৭৭টি গাছ থেকে ৩৯.০৭ কেজি আলু উৎপাদিত হয়েছে, যেখানে কৃষকের প্রচলিত পদ্ধতিতে ৭৯টি গাছ থেকে উৎপাদন হয়েছে ৩৫.১৪ কেজি।
ফলাফলে দেখা যায়, সুষম ও পরিমিত সার ব্যবহারের মাধ্যমে কম সার প্রয়োগ করেও বেশি ফলন অর্জন করা সম্ভব। এতে সার খরচ কমানো এবং উৎপাদন বৃদ্ধি-উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে সার আমদানি ব্যয় কমানো এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বক্তারা আরও বলেন, ‘খামারি’ মোবাইল অ্যাপের মতো প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ কৃষকদের সঠিক ও বৈজ্ঞানিক পরামর্শ প্রদান করে টেকসই কৃষি উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। এ ধরনের মাঠ দিবস কৃষকদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই)। মাঠ দিবস অনুষ্ঠানে প্রজনন বীজ উৎপাদন কেন্দ্রের আওতাধীন কৃষকরা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য করুন