লালন সরকার,দেবীগঞ্জ
সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে একটি পরিবারের একাধিক বৈধ ওয়ারিশের নাম বাদ দিয়ে ওয়ারিশন সনদ প্রদানের অভিযোগ উঠেছে দেবীডুবা ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি চেয়ারম্যান পরেশ চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে।অনুসন্ধানে জানা যায়, দেবীগঞ্জ উপজেলার দেবীডুবা ইউনিয়নের সোনাপোতা এলাকার বাসিন্দা আবুল হোসেন মৃত্যুকালে দুই স্ত্রী, সাত মেয়ে ও দুই ছেলে রেখে যান। অথচ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রদত্ত একটি ওয়ারিশন সনদে তার মোট ওয়ারিশ হিসেবে মাত্র সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এতে প্রথম স্ত্রীসহ তার ঘরের দুই মেয়ে ও এক ছেলের নাম বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি দেবীডুবা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ১১২ নম্বর স্মারকে চেয়ারম্যান পরেশ চন্দ্র রায়ের স্বাক্ষরিত ওই ওয়ারিশন সনদে আবুল হোসেনের স্ত্রী হিসেবে মোছাঃ ছকিনা খাতুন, ছেলে মোঃ আব্দুল্লাহ মাসুদ এবং মেয়ে মোছাঃ রহিমা বেগম (রিনা), মোছাঃ মনোয়ারা পারভীন, মোছাঃ আয়শা সিদ্দিকা, মোছাঃ রুনা লায়লা ও মোছাঃ সেরিনা আক্তারের নাম উল্লেখ করা হয়। সেখানে আবুল হোসেনের প্রথম স্ত্রী মঞ্জুয়ারা খাতুন, তার দুই মেয়ে মোছাঃ আনজুমা হাসনেয়ারা ও মোছাঃ ফাতেমা বেগম এবং ছেলে মোঃ মোজাম্মেল হকের নাম নেই।
কিন্তু অনুসন্ধানে এবং পারিবারিক তথ্য অনুযায়ী, আবুল হোসেনের দুই স্ত্রী ছিলেন-মঞ্জুয়ারা খাতুন ও মোছাঃ ছকিনা খাতুন। তার সন্তানরা হলেন সাত মেয়ে-মোছাঃ আনজুমা হাসনেয়ারা, মোছাঃ ফাতেমা বেগম, মোছাঃ রহিমা বেগম, মোছাঃ মনোয়ারা পারভীন, মোছাঃ আয়শা সিদ্দিকা, মোছাঃ রুনা লায়লা ও মোছাঃ সেরিনা আক্তার এবং দুই ছেলে-মোঃ আব্দুল্লাহ মাসুদ ও মোঃ মোজাম্মেল হক। এ ছাড়া মানিক নামে এক ছেলে অবিবাহিত অবস্থায় পিতার মৃত্যুর আগেই মারা যান।
এ বিষয়ে দেবীডুবা ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য উমাপদ রায় বলেন, মৃত আবুল হোসেনের ২ জন স্ত্রী ও ৯ জন সন্তান সহ মোট মোট ওয়ারিশ ১১ জন। প্রথম স্ত্রীর ঘরে ২ মেয়ে ও ১ ছেলে এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর ৫ মেয়ে ও ১ ছেলে রয়েছে।আর যেই ওয়ারিশন সনদ নিয়ে কথা হচ্ছে সেখানে মৃত আবুল হোসেনের ৭ জন ওয়ারিশ দেখানো হয়েছে। এতে কয়েকজন বৈধ ওয়ারিশের নাম বাদ পড়েছে, যা সঠিক নয়।
ওয়ারিশন সনদে নিজের মা ও বোনদের নাম বাদ পড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে মৃত আবুল হোসেনের ছেলে মোঃ মোজাম্মেল হক বলেন, আমার বাবার দুইজন স্ত্রী ছিলেন এবং আমরা তিন ভাই সাত বোন। এর মধ্যে মানিক নামে একজন ভাই আমার বাবার মৃত্যুর আগে অবিবাহিত অবস্থায় মারা যান। আমার মা বড় স্ত্রী অথচ আমার মা,আমাকে এবং আমার দুই বোনের নাম ওয়ারিশন সনদে দেয়া হয়নি। আমাদের পিতৃপরিচয় কেড়ে নেয়া হয়েছে। আমি দাবি জানাচ্ছি অতিসত্বর এই ওয়ারিশন সনদ বাতিল করা হোক।অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, জমির নামজারির সময় সৎ মা ও ভাইবোনদের নাম বাদ দিয়ে শুধু নিজের মা ও বোনদের নাম উল্লেখ করে ভূমি অফিসে কাগজপত্র দাখিল করেন মৃত আবুল হোসেনের ছেলে মোঃ আব্দুল্লাহ মাসুদ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল্লাহ মাসুদ কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। ওয়ারিশন সনদ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জমি সংক্রান্ত কথাবার্তা বলতে থাকেন এবং প্রতিবেদককে ম্যানেজ করার উদ্দেশ্যে বারবার দেখা করার জন্য অনুরোধ জানান। একপর্যায়ে তিনি বলেন, আপনাকে যিনি অভিযোগ দিয়েছে তাকে সাথে নিয়ে আসেন এরপর ওয়ারিশনের বিষয়ে উত্তর দিবো।
অন্যদিকে অভিযোগ উঠেছে, ওয়ারিশন সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই এবং প্রয়োজনীয় তদন্ত ছাড়াই আর্থিক সুবিধা নিয়ে চেয়ারম্যান পরেশ চন্দ্র রায় স্বাক্ষর প্রদান করেছেন।
এ বিষয়ে দেবীডুবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পরেশ চন্দ্র রায়ের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি শপথ নিয়েছি ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি আর ওয়ারিশনে তারিখ দেয়া ২০২২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। আমি এই ওয়ারিশনে স্বাক্ষর করি নাই। আমার স্বাক্ষর ইডিট বা জাল করা হয়েছে।
স্বাক্ষর জাল করে তৈরি করা ভুয়া ওয়ারিশন সনদ বাতিলের কোন ব্যবস্থা গ্ৰহন করা হবে কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অভিভাবক হিসেবে আছেন। তার সঙ্গে পরামর্শ করে এ বিষয়ে জানাবো।
এই বিষয়ে জানতে স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সীমা শারমিনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বক্তব্য জানতে চেয়ে বার্তা পাঠানো হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য করুন